আজকের গল্প! ‘আশ্রয়’ – (সত্য ঘটনা অবলম্বনে!)

চোখটা খুলতেই ব্লাইন্ডসের ফাঁক দিয়ে আলোর ফোটনকণা ঝাঁপিয়ে পড়লো একসাথে, চোখ ধাঁধিয়ে গেল পুরো, আলো আর অন্ধকারের মিশেলে আবছা ভাবে বুঝতে পারলাম কেউ দাঁড়িয়ে আছে সামনে। সামনের কালো পর্দা সরতে লাগলো আস্তে আস্তে আর হঠাৎ করে চোখ খোলার জন্যেই মনে হয় মাথার শিরাগুলো দপদপ করে উঠলো, ব্যথার কাঁকড়াবিছে ছড়িয়ে পড়লো সারা শরীরময়, মুখটা আপনাতেই কুঁকড়ে গেল যন্ত্রণায়।
“গুড মর্নিং স্যার। কেমন আছেন?” নার্সের গলা।
“মর্নিং, ফিলিং বেটার।”
“এই কিছুক্ষণ আগেই স্যার দেখে গেলেন আপনাকে। বললেন আপনাকে যেন বেশি বিরক্ত না করি।”
“আর বিরক্ত! আরেকটু হলে প্রাণ নিয়ে টানাটানি পড়ে গেছিল আর কি।… তা ঐদিকে সব ঠিক আছে?”
“হ্যাঁ, স্যার। অনেকটা কন্ট্রোলে।…আপনি ওই নিয়ে বেশি চিন্তা করবেন না।”
“এখনো ঠিক করে বিশ্বাসই করে উঠতে পারছি না, কী থেকে যে কী হয়ে গেল।…” দীর্ঘশ্বাস ফেললাম আমি।
ঘাড় ঘুরিয়ে দেখলাম একা নার্সই নয়, আরো একজন ড্যাবড্যাব করে আমার দিকে তাকিয়ে আছে। ব্যথার মধ্যেও ভালো লাগলো আমার, বটু বসে আছে বিছানায়। হাত নেড়ে সামনে ডাকলাম আমি, চুলগুলো ঘেঁটে দিয়ে বললাম, কিছু খেয়েছিস? সম্মতিসূচক মাথা নাড়লো। পায়ের দিকে দেখিয়ে জিজ্ঞেস করলাম, ব্যথা আছে কিনা।

নার্স হাসতে হাসতে বললো, “কি জেদী বাচ্চা, সকালে ঘুম থেকে উঠেই বলে ভালোকাকু কই? কতবার বললাম আপনি ঘুমোচ্ছেন, তবু কে শোনে কার কথা! এখানে চুপটি করে বসে আছে আপনি কখন উঠবেন।”
“তাই?”
“ভালোকাকু, তোমার খুব ব্যথা করছে না গো?”
আমি হাসলাম, “নারে বাবু।” ব্যথা যতটা না শরীরের তার থেকে বেশি মনের। “একটু ব্যথা হচ্ছে, কিন্তু সেরে যাবে, এই যে নার্সদিদি ওষুধ দিচ্ছে।…কালকে তো কথাই হয়নি, তুই বল এবার, থাকিস কোথায় তুই?”
“ওই তো ব্রিজের তলায় যে বস্তিটা আছে, ওখানে।”
“আচ্ছা, বাড়িতে কেউ নেই?”
বটু বলার আগেই নার্স বললো, “স্যার, এখন উকিলি জেরা শুরু না করলেই নয়, প্লিজ এত কথা বলবেন না এখন, কালকে প্রচুর ব্লিডিং হয়েছে, এমনিই শরীর দুর্বল। ভৌমিক স্যারও বলে গেছেন কমপ্লিট বেডরেস্ট।”
ব্যাজার মুখে বললাম “আর কি, স্যারের আদেশ শিরোধার্য!”
“আপনি পারেনও বটে! কালকে একটুর জন্য ফাঁড়া কেটেছে, আর আপনি মজা করছেন?…বটু, ওঠ তো এখন, ভালোকাকু একটু চোখ বন্ধ করে শুয়ে থাকুক, তুই পরে আসবি আবার।” বটু বাধ্য ছেলের মতো আমাকে টাটা করে উঠে চলে গেল নার্সের সঙ্গে।
সত্যিই, ভগবানের কী লীলা মাইরি! কিছুদিন আগে বলছিলাম কদিনের রেস্ট চাই, ভালো লাগছে না একঘেয়েমি কাজ, ওপরওয়ালা শুনেছেন, নে এবার কত রেস্ট নিবি!

(২)
আমাদের ডাক্তারদের নিত্যদিনের কাজই হলো রোগের সঙ্গে যুদ্ধ করা, রোগীকে সুস্থ করে তোলা এবং অনেকসময় মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরিয়ে আনা। সেখানে রোগীর মনের জোর তো আছেই, তার সাথে যে একটা অদৃশ্য ফ্যাক্টর কাজ করে ‘ভগবান’; সেই দড়ি টানাটানি খেলায় হয় আমরা জিতি নয়তো সে। আমরা আমাদের চেষ্টাটুকু করতে পারি, বাকিটা তো তাঁর ইচ্ছে। ডাক্তারি পড়তে পড়তে আমাদের যে জিনিসটা শেখানো হয়, সেটা হলো মন শক্ত করা, সেখানে দুঃখ,কষ্টের কোনো জায়গা নেই। কিন্তু হাজার হোক মন তো, বিচ্যুতি তো তার হয়ই। সিনিয়র ডক্টর ভৌমিক স্যার আমাকে মাঝে মধ্যেই বলেন “এত বছরে মৃত্যু তো কম দেখলাম না, কিন্তু ব্যাপারটা কী বলতো সেটাকে মনে নিতে নেই। তুই যত তাড়াতাড়ি ভুলতে পারবি, তত ভালো। অপারেশনের সময়ে মন স্টেবল না থাকলে চলে?”  আমি চুপচাপ শুনি খালি, কে জানে কবে অতটা শক্ত মনের হতে পারব। আসলে আমার মতে কোনো রোগীকে সুস্থ করতে হলে তার সঙ্গে বন্ধুত্ব পাতানো আগে দরকার, এতে ট্রিটমেন্টে অনেকটা সুবিধা হয় তবে অসুবিধাও আছে। ভিজে হাতে জড়ানো চুল ছাড়ানো যেমন কঠিন, তেমনই একটা মানুষের সঙ্গে জড়িয়ে পড়লে তাকে ভোলা বড্ড শক্ত। সেরকমই কাল সকালে এক ভদ্রমহিলা ভর্তি হয়েছিলেন হাসপাতালে, বয়স সত্তরের কাছাকাছি, হার্ট অ্যাটাক। রান্না করার সময় হঠাৎ করে বুকে ব্যথা শুরু হয়, তারপর অজ্ঞান হয়ে যান। আমরা বাড়ির লোককে বলেছিলাম হার্টের যা কন্ডিশন বাইপাস করানো বেটার কিন্তু এটাও ঠিক বয়স হয়েছে, সুগার আছে, কতটা সামলাতে পারবেন না পারবেন। ওরাও বলেছিল আলোচনা করে জানাবে।

চেক আপ করার সময়ে পালস রেট মাপতে মাপতে বলছিলাম, “কী গো দিদা, ওপরে যাওয়ার এত তাড়া কেন তোমার?”
দিদা হাসছিল, কিছু বলছিল না।
“শুনলাম এই বয়সেও সবাইকে রেঁধে খাওয়ানোর খুব শখ, খালি হাঁটুটা সাথ দেয়না তোমার। এখান থেকে সুস্থ হয়ে ফিরে আমাকে খাওয়াবে তো, নাকি? না, ভুলে যাবে?”
“কী খাবি বল? যমের মুখ থেকে একবার যখন ফিরেছি, তোকেও খাওয়াব নিজে হাতে, এইটুকুই তো পারি আমি।”
“সত্যি তো? ব্যাস। এমনিও সুস্থ হয়ে গেলে ডাক্তারকে কেউ মনে রাখে না। তুমি যে বললে, এতেই খুশি।”

দুপুরবেলা বাড়িতে গেছিলাম একবার, শনিবার আমার একটু হালকা থাকে নিতান্তই যদি কোনো এমার্জেন্সি না পড়ে। বাড়িতে ওই একদিনই মা বাবার সঙ্গে দুপুরে বসে খাওয়া হয়, রাতে আমার ফেরার কোনো ঠিক থাকে না, তাই অপেক্ষা করতে বারণ করি। এমনিও দুজনের বয়স হয়েছে, দুজনেই রিটায়ার্ড, বাবা কিডনির পেশেন্ট আর মা এখনো বাড়িতে গানের ক্লাসটা করায়। এখন ওদের দুজনের চিন্তা আমার বিয়ে। এই তিরিশ পেরিয়ে বয়স গুটি গুটি পায়ে এগিয়ে চলেছে, ছেলে এখনো আইবুড়ো, চিন্তাটাই স্বাভাবিক। প্রতিদিন একবার করে এই কথাটা ওঠেই আর আমি কথা ঘোরাই। জানি না আর কদিন চলবে এভাবে কারণ মায়ের ইমোশনাল ব্ল্যাকমেল। এককালে বলতো বাবু, এখন প্রেমের বয়স নয়, পড়াশোনা কর, রোজগার কর, নিজের পায়ে দাঁড়া।  ফলে স্বভাবতই পড়াশোনার চাপ, মায়ের ‘শার্লক হোমসের’ মতো নজর এড়িয়ে প্রেমটা আর করা হয়নি, কিছুসময় ঝাড়ি মারা আর ক্ষণিকের ভালো লাগা ছাড়া সেইভাবে কাউকে মনেও ধরেনি।

আর এখন বলে, কী রে তুই? এখনো কাউকে জোটাতে পারলি না? এই বুড়ো বয়সে আমাদের পাত্রী খুঁজে বেড়াতে হবে? বোঝো ঠেলা! পাত্রী যেন ছেলের হাতের মোয়া, খুঁজলেই চলে আসবে, যদিও আমার কথা ঘোরানোর আরো একটা কারণ আছে জানিনা বাস্তবে সম্ভব হবে কিনা তবু সম্ভাবনাটুকু নিস্তরঙ্গ জলের ওপর ঘাঁই মেরে যায়। আসলে কেন জানি না এখন মনে হয় জীবনে আরেকজন মানুষের সত্যি খুব দরকার। এই রোগী, রুটিন ভিজিট, হসপিটাল, অপারেশন এসবের পর ক্লান্ত শরীরটা একটু আরাম পেতে চায়, চায় একটা নিশ্চিন্ত আশ্রয়, চায় তার মনের কথা শোনার জন্যে কেউ থাকুক, এই আপনভোলা পাগলটার জন্যে কেউ অপেক্ষা করুক, চায় তার কোলে মাথা রেখে রাতের আকাশের তারা গুনতে। এই একঘেয়েমি, চিরাচরিত রুটিনে চায় একটু তাজা ঠান্ডা হাওয়া যেভাবে হাঁসফাঁস গরমে আসে কালবৈশাখী। বুঝতে পারছি, প্রেমে ধুপ করে পড়ার জন্যে মনটা আঁকুপাঁকু করছে, ওই অবসর টাইমে গল্প পড়া কিংবা খাওয়ার সময় সিরিয়াল দেখার ফল। কিন্তু ছ্যাঁকা খেয়ে ব্যথা নিয়ে দেবদাস হয়ে গেলে কে সামলাবে?

(৩)
সকাল থেকেই আকাশ মেঘলা, রোদের তেজ বেশি নেই কিন্তু ভ্যাপসা গরম, এখন এই বিকেলের দিকে ঠাণ্ডা একটা হাওয়া দিচ্ছে। লাঞ্চ সেরে স্টাডিরুম থেকে একটা ম্যাগাজিন তুলে নিয়ে ব্যালকনিতে বসে আছি, আমার খুব পছন্দের জায়গা। ভোরবেলা কোনো কোনোদিন ঘুম ভেঙে গেলে উঠে চুপচাপ বসে থাকি; শান্ত, স্নিগ্ধ পরিবেশটা মন ভালো করে দেয়, সারাদিনের এনার্জি নিয়ে নিই এই সময়ে।
আর একঘন্টার মধ্যেই বেরোব, প্রথমে হসপিটাল তারপর ওখান থেকে আশ্রয়। ‘আশ্রয়’ একটা বৃদ্ধাশ্রম, ওখানেই নয়নের সাথে পরিচয় হয়েছিল, দিনটা মনে আছে এখনো।

মাস ছয়েক আগের কথা, রাতের বেলা OT সেরে গাড়ি চালিয়ে ফিরছি, নার্সারির পাশ দিয়ে গাড়িটা ঢোকাব এমন সময় একটা মেয়ের গলার আওয়াজে চমকে গেলাম। রাত কম করে হলেও সাড়ে বারোটা, এত রাতে? বিপদ হলো না তো? কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে গেলাম। লক্ষ্য করলাম একা মেয়েটাই নয়, আরেকটা লোকও আছে সঙ্গে। আমার গাড়িটা দেখেই ওরা এগিয়ে এলো। মেয়েটা বললো, “দাদা, একটা হেল্প করুন না। একজন গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়েছে। আমাদেরকে একটু কাছের নার্সিং হোমটায় নিয়ে চলুন না?”
“অফকোর্স। পেশেন্ট কোথায়?”
“এই তো, আমাদের এই বৃদ্ধাশ্রমে। এই নার্সারির পিছনেই।”

গিয়ে যা বুঝলাম, হসপিটালে নিয়ে যাওয়ার মতো কিছু নয়। ভদ্রলোকের এপিলেপসি আছে, রাতের বেলা বই পড়ছিলেন নিজের ঘরে তারপর হঠাৎই একটা পড়ে যাওয়ার আওয়াজ শুনে একজন এসে দেখে এই কান্ড, প্রচণ্ড খিঁচুনি, তারপর মুখ থেকে গ্যাজলা বেরিয়ে অজ্ঞান হয়ে যান। ওষুধ আনিয়ে খাইয়ে দিয়ে মেয়েটাকে বলছিলাম চিন্তার কিছু নেই, এরকম হয়। ভদ্রলোক মনে হয় ওষুধ খাচ্ছিলেন না ঠিক করে, একটু খেয়াল রাখবেন।

মেয়েটা আর সঙ্গের লোকটা এগিয়ে দিতে এসেছিল।
“স্যার, আপনার ফিজটা?”
“কী বলছেন ম্যাম, কীসের ফিজ?”
“না মানে… এত রাতে…”
“এটা আমার ডিউটি। আর কার্ডটা রাখুন।”
“তবুও স্যার…”
“এখানকার হেডকে বলে আমার মাঝেমধ্যে আসার পারমিশন করিয়ে দিতে পারবেন কি? সেইটুকু করলেই আমি খুশি।…ভালো থাকবেন, bye “
এখানেই হয়তো কথা শেষ হতে পারতো, হয়তো ভুলেও যেতাম কিন্তু ওপরওয়ালার ফন্দি ছিল অন্য। গাড়িটা স্টার্ট দিয়েছি জাস্ট, কয়েকটা কথা কানে এলো,
“জানি, সময় মিথ্যে নয়
ভালো মানুষেরা আজও যায়নি পৃথিবী ছেড়ে।
ভালোবাসা বেঁচে থাক
মানুষই আজ মানুষকে থাকে ঘিরে।”
আর একটা বুনোফুলের গন্ধ। কিছু গন্ধ, কিছু কথা, কিছু মুহূর্ত আর তার সঙ্গে জড়িয়ে থাকা কিছু মানুষ মনের মধ্যে গেঁথে যায়। বুঝলাম বুকের মধ্যের নরম মাটি বসে গেল। পিছনে না তাকিয়েও আন্দাজ করলাম ওই এক জোড়া চোখে শুধু শ্রদ্ধা না বরং আরো কিছু রয়েছে। বুঝলাম ওই বাদামি মণির মায়ায় জড়িয়ে পড়ছি আমি। আর বুঝলাম কথাগুলো শুধু স্বগতোক্তি নয়, এর অনুরণন আমার কানে ঘুরবে আজীবন।

(৪)
তারপর থেকে সময় সুযোগ পেলেই শনিবার করে যাই ওখানে। ‘আশ্রয়’ একটা উপলক্ষ্য মাত্র, নয়নের সাথে দেখা করাই মূল উদ্দেশ্য। নয়নিকা ঘোষ, মাস্টার্স ফাইনাল ইয়ার, যাদবপুর বাংলা ডিপার্টমেন্ট। ছাপোষা, সাদামাটা, পাঁচজনের মধ্যে আলাদা করে চোখে পড়ার মতো কিছু না, তবুও এই কয়েকমাসে যত দেখেছি, যত কথা বলেছি, যত চিনেছি মুগ্ধ হয়েছি আমি। আকৃষ্ট হয়েছি ওর জীবন সম্পর্কে চিন্তাভাবনায়, মানুষের সঙ্গে অদ্ভুতভাবে মিশে যাওয়ায়। এই বৃদ্ধাশ্রমের সঙ্গে রয়েছে এক বছর মতো, তবে আরো কিছু এনজিওর সাথে যুক্ত।
নিজের ব্যাপারে সম্পূর্ণ উদাসীন কিন্তু মানুষের বিপদে আপদে এই শান্ত মেয়েটাই ঝাঁপিয়ে পড়ে নির্দ্বিধায়। ওর ইচ্ছে নেট ক্লিয়ার করে কলেজের প্রফেসর হবে, আগে নিজের পায়ে শক্তভাবে দাঁড়াবে আর পাশাপাশি এগুলো তো চলবেই।

ভেবেছিলাম ওর জন্মদিনটা একটু অন্যরকমভাবে সেলিব্রেট করব, অবশ্যই জানিয়ে নয় কারণ ও বড্ড ইন্ট্রোভার্ট আর কথা প্রসঙ্গেই ওর জন্মতারিখটা বলেছিল আমায়। ইচ্ছা ছিল এই বৃদ্ধাশ্রমের মানুষগুলোকে নিয়ে সন্ধ্যাবেলা একটু অন্যরকম কাটাব। ফোন করেছিলাম বিকেলে ‘আশ্রয়’ এ দেখা করার জন্যে কিন্তু বলেছিল হবে না, কাজ আছে, বেরোতে হবে ওকে, হয়তো আন্দাজ করেছিল আমার প্ল্যান। অনেক করে বলেছিলাম কিন্তু মুখের ওপর “না” করে দিয়েছিল। খারাপ লেগেছিল জানেন, বাড়িতেই তো আছে, কী এমন কাজে যাচ্ছে যে দেখা করার সময়টুকু হবে না? ভুল বুঝেছিলাম, ভেবেছিলাম হয়তো কিছু লুকিয়ে যেতে চাইছে, সন্দেহও করেছিলাম বইকি! আমি কি নিজেদেরকে নিয়ে অতিরিক্ত কিছু ভাবছি? মেয়েটাও তো প্রয়োজনের বেশি কথা বলে না। ওই বৃদ্ধাশ্রমে কাটানো সময়টুকুতে সঙ্গে থাকলেও খানিকটা যেন সরে সরে থাকে, চারটে মেসেজের একটা রিপ্লাই দেয়। আচ্ছা, মেয়েটার জীবনে অন্য কেউ নেই তো? অজস্র উল্টোপাল্টা চিন্তা ভিড় করছিল মাথায়। নাহ, এর একটা শেষ দেখা দরকার! জানা দরকার মেয়েটার সঙ্গে এতদিনের আলাপ সত্ত্বেও কেন এইভাবে এড়িয়ে চলে আমায়, কেন পিছলে পিছলে থাকতে চায়। আচ্ছা, প্রেমই কি এই অধিকারবোধের জন্ম দেয়?

একদিন আশ্রয় থেকে ফিরতে দেরি হওয়ায় বাড়িতে ড্রপ করে দিয়েছিলাম, ও না করেছিল বহুবার, তাও। ওর বাড়ি চিনতাম, সেদিন বিকেলে একটা বাইক জোগাড় করে ফলো করতে শুরু করি। প্রায় আধঘন্টা ট্যাক্সির পিছনে নিরাপদ দূরত্ব বজায় রেখে পৌঁছে যা দেখলাম তার জন্যে মোটেও প্রস্তুত ছিলাম না। আচ্ছা, তাহলে আছে একজন। লুকানোর দরকার ছিল না, সত্যিটা বললেই পারতো, এতটাও অবুঝ নই আমি। তারপর ওরা দুজন ঢুকে গেল এক জায়গায়। মন বলছে আর নয়, এবার চলো, কারোর প্রাইভেসিতে ঢুকে পড়া অন্যায়। কিন্তু মাথা বলছে এতটা যখন এসেই পড়েছ, শেষটাও দেখে নাও, সামনাসামনি দেখলে অনুভূতিগুলোকে গলা টিপে মারতে সুবিধা হবে। শেষ পর্যন্ত মনের কথা না ভেবে মাথার কথাই শুনি, বাইকটাকে গ্যারেজ করে ফ্ল্যাটের কাছাকাছি যখন পৌঁছাই ততক্ষণে সামনের ছবিটা আমার কাছে মোটামুটি পরিষ্কার। গেটের দারোয়ানকে জিজ্ঞেস করলাম,
“এখানে নয়নিকা ঘোষ বলে কেউ থাকে?”
“কিউ? আপ কৌন হো?”
“মে ডক্টর হু, ইয়ে হ্যা হামারা কার্ড। উসনেই হামকো বোলা থা ইহা পার আনেকে লিয়ে। ”
“তো আপ ফোন কিউ নেহি কার রাহে?”
“ফোনপে নেহি মিল রাহা হ্যায়, ইসি লিয়ে আপকো কেহে রাহা হুঁ।”
দারোয়ানটা কিছু একটা ভাবলো তারপর নিজেই বললো যে দোতলায় প্রিয়ম দত্ত বলে একজন থাকেন, তার সঙ্গেই এসেছে নয়নিকা। ভদ্রলোকের মেয়ে অসুস্থ, বাচ্চা মেয়ে, সুইসাইড অ্যাটেম্পট করেছিল, আগে থাকতো অন্য জায়গায়, কদিন হলো এখানে এসেছে। তারপর থেকে নয়নিকা আসে দেখা করতে, ওই কাউন্সেলিং টাইপ আর কি। আরো অনেক কথাই বলছিল, কিন্তু আমার কানে ঢুকছিল না। মেয়েটাকে ভুল বুঝলাম আমি! এতটা খারাপ চিন্তা করতে পারলাম? এতদিন মেশা সত্ত্বেও চিনতে ভুল করলাম? দারোয়ানকে ধন্যবাদ জানিয়ে বেরিয়ে গেলাম ওখান থেকে। জন্মদিনের প্ল্যান যখন করেছি সেটাকে মাঠে মারা যেতে দেব না।

বেলের আওয়াজ শুনে দরজা খুললেন ভদ্রলোক। আমি পরিচয় দিলাম নিজের, বললাম নয়নিকাকে একটা সারপ্রাইজ দেওয়ার আছে, সাথে তাঁর মেয়েকেও। ভদ্রলোক কিছুক্ষণ ভাবলেন, তারপর ডাকলেন ভেতরে।
প্রিয়মবাবু আমাকে বলছিলেন নিজের কথা, বলছিলেন নয়নিকা না থাকলে ওনার মেয়ে এতটা স্বাভাবিক হতে পারতো না।… “আজকালকার ছেলেমেয়েদের এই হয়েছে জানেন, সহজ জিনিসগুলো সহজভাবে নিতে পারে না, কোনো প্রবলেম হলে বাড়ির লোকেদের সাথে শেয়ার করে না, খালি ভাবে লোকে জাজ করবে, বাড়ির লোকের কথাও ভাবেনা, ভাবে কিছু না পেলেই জীবন শেষ, দুমদাম হঠকারী সিদ্ধান্ত নিয়ে নেয়।…আমার কী আছে বলুন তো ও ছাড়া? স্ত্রীকেও বাঁচাতে পারিনি, আমাকে ছেড়ে চলে গেছে, এখন শেষ আশ্রয় বলতে তো ওই।” ভদ্রলোকের গলায় তীব্র বিষাদ, প্রিয়জনকে হারিয়ে ফেলার আতঙ্ক। ওনার পিছন পিছন মেয়ের ঘরের দিকে এগোলাম।
ঘরে খাটে বসে মেয়েটার সাথে কথা বলছিল নয়ন, হাসছিল। অপরদিকের মেয়েটার মুখেও হাজার ওয়াটের হাসি। আজকাল সত্যিকারের হাসির বড় অভাব। আমরা কজন বলুন তো খুশি থাকার চেষ্টা করি? সবসময় এটা নেই, ওইটা পাইনি, এটা হলে ভালো হতো এসব ভেবেই দুঃখযাপন করি। জীবনের ছোটখাটো মুহূর্তগুলোতেই যে কত খুশি, কত ম্যাজিক লুকিয়ে থাকে সেটাকে গুরুত্ব দিই না। আর সেখানে দাঁড়িয়ে অন্যের মুখে হাসি ফোটানো, তাকে একটু সময় দেওয়া, তার কথা একটু শোনা; আমরা কজন করি? কতজন পারি বলুন তো অন্য কারোর হাসির কারণ হতে।

আমার আওয়াজ পেয়ে ভূত দেখার মতো চমকে উঠলো নয়ন।
“তুমি? এখানে?… মানে কীভাবে?”
“সে না হয় বলব পরে। হ্যাপি বার্থডে নয়ন, ভালো থেকো, ভালো রেখো আর এরকমই থেকো। ভাগ্যিস মিথ্যে বলেছিলে আমাকে, নাহলে অনেককিছু অজানাই থেকে যেত।…রিমা, একটা কেক এনেছি, তুমি আর ম্যাম একসাথে কাটবে। আজ শুধু ম্যামের জন্মদিন নয়, তোমারও এই নতুন জীবনের জন্মদিন। তোমাকেও প্রতিজ্ঞা করতে হবে যে তুমি এমন কিছু করবে না যাতে তোমার কাছের মানুষগুলো কষ্ট পায়। আঘাত আমরা সকলেই পাই অল্প বিস্তর, কিন্তু তার কষ্ট চেপে রাখা উচিত না, কষ্ট চেপে থাকতে থাকতে বার্স্ট করে একদিন। বরং কষ্টগুলো কান্নার মধ্যে দিয়ে বের করে দিও, কাছের মানুষগুলোকে বলে হালকা করে দিও। জেনে রাখো কষ্ট মানুষকে একা করে দেয়।…আর পাপার তুমি ছাড়া আর কে আছে বলো তো?”

শক্ত মনের নয়ন বোধহয় এতটা সারপ্রাইজের জন্যে মোটেও প্রস্তুত ছিল না। হাসিমুখে কেক কাটছিল, খাইয়ে দিচ্ছিল আমাদেরকে কিন্তু মনের মধ্যে তোলপাড় হচ্ছিল ওর। বহুবছর ধরে ভেতরে জমানো কষ্টগুলো ফেটে বেরিয়ে আসতে চাইছিল। অনেকক্ষণ সংযত করেছিল নিজেকে। বাইকে করে ওকে নিয়ে ফেরার সময় একটাও কথা বলেনি, আমিও না। আসলে বুঝতে পারছিলাম না কোন মুখে ক্ষমা চাইবো, বুঝিয়ে বলব তো বটেই কিন্তু কথা বললে তবে তো!
রাস্তার ধারে একটা কদম গাছ দেখে দাঁড়িয়ে পড়েছিলাম আমি, ফুলের প্রতি আকর্ষণ আমার ছোটবেলা থেকেই। তুলনামূলক পরিষ্কার জায়গা থেকে ফুলগুলো তুলে একটা প্যাকেটে ভরছিলাম, পেশেন্টদের উপহার। নয়ন চুপটি করে দাঁড়িয়ে দেখছিল আমায়। শুধু কি ওই দেখছিল আমিও কি পাল্টা তাকাইনি? হঠাৎই ও ছুটে এলো আমার দিকে, হাত ধরে কিছু বলার চেষ্টা করলো কিন্তু তার বদলে বেরিয়ে আসলো ফোঁপানি, ভেতরের অবাধ্য জল দুষ্টু বাচ্চার মতো চোখের পাঁচিল বেয়ে উঠে আসলো আর ও জড়িয়ে ধরলো আমাকে। মেঘের ভেতর জমে থাকা বৃষ্টি ঝরে পড়লো আমার গায়ে, ভিজিয়ে দিল আমার শার্ট, বুনো ফুলের পারফিউম আঁকড়ে ধরলো আমাদের আর কান্নার গভীর শ্বাসের অতল থেকে ভেসে আসলো, “Thank you. Thank you for gifting me the day। Sorry, তোমায় না আমি মিথ্যে বলতে চাইনি। “হাতটা কাঁধে রাখলাম ওর, আলতো করে বললাম, “বন্ধুত্বে থ্যাঙ্কস, সরি এসবের জায়গা নেই। যদি সত্যিই বন্ধু মনে করো তাহলে কষ্টগুলো শেয়ার করতে পারো, হালকা লাগবে।” সেদিন বুঝতে পেরেছিলাম সবাইকে ভালো রাখতে চাওয়া মানুষেরও একটা আশ্রয় লাগে, কষ্টের আশ্রয়, জমিয়ে রাখা কথার আশ্রয়, বিশ্বাসের আশ্রয়, সমর্পণের আশ্রয়, সর্বোপরি ভালোবাসার আশ্রয়।

(৫)
হঠাৎ করে ফোন আসতেই সম্বিৎ ফিরল, নয়ন।
“আসছো তো আজকে?”
“হ্যাঁ। একটু ভিজিট করেই বেরিয়ে যাব।”
“একটু তাড়াতাড়ি এসো না, বড়দির সাথে কিছু কথা আছে।”
“আচ্ছা, চেষ্টা করব।”
ফোনটা রেখে উঠলাম আমি।
সেদিনের পর থেকে আমাদের সম্পর্কটা একটু সহজ হয়েছে, এখন নিজেই কথা বলে। ওর কাছ থেকেই জানতে পেরেছি ও একটু বড় হওয়ার পর ওর মা বাবার মধ্যে সামান্য কারণে ঝগড়া, অশান্তি হতো। ভুল বোঝাবুঝি, বাজে সন্দেহ, অশ্রাব্য গালিগালাজ, কাদা ছোঁড়াছুঁড়ি; জীবনটা বিভীষিকা হয়ে গেছিল ওর কাছে। এমনিই মাবাবা দুজনেই চাকরি করতো, মেয়ের সাথে কোয়ালিটি টাইম বলতে ওই সন্ধ্যেটুকু কিংবা ছুটির দিনগুলো, তাও নষ্ট হতে বসেছিল নিজেদের মধ্যে খাওয়াখায়িতে। যাদের উচিত ছিল মেয়েটার কোমল মনকে আগলে রাখার, তাঁদের ধাক্কাতেই মেয়েটা বড় হয়ে গেছিল, চুপচাপ হয়ে গেছিল। এসবের মধ্যে থেকে ওকে সরিয়ে রেখেছিল ঠাম্মি, ওই বিভীষিকার দিনগুলোয় দরজা বন্ধ করে নাতনিকে আঁকড়ে বসে থাকতেন তিনি। আর সেই ঠাম্মি চোখ বোজার পর মেয়েটা আরো একা হয়ে যায়। নিজের দুঃখ, কষ্টগুলো নিজের মধ্যে চেপে রাখতে শিখে যায় তখন থেকেই। তারপর বাবা মায়ের ডিভোর্স, নয়ন ওর বাবার সাথেই থেকে গেছে কলকাতায়। মায়ের এখন অন্য সংসার, মাঝেমধ্যে ফোন করে, খবর নেয় কিন্তু নয়ন বোঝে ওতে সেই টান নেই, ও আসলে মা আর বাবার কেটে যাওয়া সুতো। আর এসবের পরই মেয়েটার ভালোবাসা থেকে বিশ্বাস উঠে গেছে, চরম একাকীত্ব যাতে গ্রাস না করে তাই এই বৃদ্ধাশ্রম, এনজিও। পরিস্থিতি ওকে টাফ বানিয়ে দিয়েছে, ওর মনকে পরিয়ে দিয়েছে বর্ম, ওর চারপাশে তুলে দিয়েছে দেওয়াল আর এই দেওয়াল ভাঙা খুব সহজ নয়। ওর মন জয় করা কঠিন তবে অসম্ভব নয়। আমাকেই আরেকটু লেগে থাকতে হবে, তাড়াহুড়ো করলে চলবে না, ঠাণ্ডা মাথায় ধৈর্য্য ধরে এগোতে হবে। প্রেম শুধু অধিকার বোধের জন্ম দেয় না, ধৈর্য্য ধরতেও শেখায়।

রেলগেটটা পেরিয়ে বাঁদিকে যাব, ডানদিকে একটা জটলা দেখে ভুরু কুঁচকে গেল আমার, কী হয়েছে সামনে? গাড়িটা একপাশ করে নামলাম। গিয়ে দেখলাম একটা বাচ্চা, ছয় সাত বছর বয়স, হাঁটুতে একটা ক্ষত, কনুই ছড়ে গেছে, পাশে একটা বালতি পড়ে, আর ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে কিছু ভর্তি বোতল। একজন ওই ক্ষতর রক্ত ধুয়ে তুলো দিয়ে মুছছে। ভিড়ের মধ্যে কথাবার্তায় যা বুঝলাম, রেলগেট পড়ছে দেখে এক বাইক আরোহী স্পিড বাড়িয়ে দেয় আর হঠাৎ করে বাচ্চাটা সামনে চলে আসায় পাশ কাটাতে গিয়ে ধাক্কা মারে, তারপর ভয়ে বাইক কাটিয়ে বেরিয়ে যায় আর বাচ্চাটা গিয়ে পড়ে ওই এবড়োখেবড়ো পাথরটায়। ছেলেটার হাঁটু থেকে রক্ত বেরিয়েই যাচ্ছে, বেশ জোরেই পড়েছে মনে হয়। এখন এখানে দাঁড়িয়ে লোকের কথা শুনলে আরো সময় নষ্ট হবে তাই সামনে গিয়ে পকেট থেকে রুমাল বের করে বাচ্চাটার হাঁটুতে বাঁধলাম তারপর চ্যাংদোলা করে তুললাম গাড়িতে। হসপিটালে নিয়ে যাই আপাতত, তারপর নিজেই ছেড়ে দিয়ে যাব।

নার্সকে বলছিলাম ছেলেটার ক্ষতটা পরিষ্কার করে, ওষুধ দিয়ে আমাকে একবার জানাতে। হঠাৎই অনি আসলো কেবিনে
“স্যার, সকালের পেশেন্টটা কেমন করছে। আমার ব্যাপারটা সুবিধার ঠেকছে না, তাড়াতাড়ি চলুন।”
এই রে, এ তো অ্যাটাকের ইঙ্গিত। আগেরটা মাইনর ছিল। অনির সাথে ছুটলাম আমি। ভদ্রমহিলার মুখে যন্ত্রণার ছাপ স্পষ্ট, অনি আগেই নার্সকে ইনজেকশন আনতে পাঠিয়েছে। ওই কষ্টের মধ্যেও দিদা হাত নেড়ে ডাকলো আমায়। আমার হাতটা ধরে বললো, “বাবু, কিছু মনে করিসনা…মনে হচ্ছে…তোর কথাটা রাখতে পারব না আর…”
“দিদা কথা বলো না প্লিজ, তোমার কিছু হবে না, আমি বলছি তো, আরেকটু কষ্ট সহ্য করো।… অনিই, ইঞ্জেকশন আনতে এত সময় লাগছে কেন?”
“আমার সময় ফুরিয়েছে রে বাবু…এই জন্মে না হোক… অন্য কোনো বার, অন্য কোনো জন্মে…আবার দেখা হবে তোর…”
কথাটা শেষ হলো না, মানুষটা স্থির হয়ে গেল একদম, চোখের কোণা থেকে জল বেরিয়ে এলো, দৃষ্টি আমার দিকেই, আমার হাতে তখনো হাতটা ধরা। শেষ, সব শেষ। দিদার হাতের শেষ ওমটুকু শুষে নিচ্ছে আমার ঠাণ্ডা হাত। বাঁচাতে পারলাম না আমি, ভরসার দাম দিতে পারলাম না। ততক্ষণে নার্স চলে এসেছে ইঞ্জেকশন নিয়ে কিন্তু আর কিচ্ছু করার নেই। হাতটা ছাড়িয়ে নিলাম, চোখদুটো বন্ধ করে দিয়ে, নমস্কার করে বেরিয়ে এলাম কেবিন থেকে। মৃত্যু মানা যায় কিন্তু চোখের সামনে কেউ মারা গেলে তা ভোলা খুব কঠিন। বুঝলাম কিছুক্ষণ একা থাকতে হবে আমায়, মনের সঙ্গে যুদ্ধ করতে হবে। সময়, বড় অদ্ভুত জিনিস, সকালেই যে মানুষটা আমার আব্দার মেটাবে বলেছিল, সে পাড়ি দিয়েছে অন্যলোকে, অত কষ্টের মধ্যেও আমাকে দেওয়া কথা ভোলেনি। আসলে ভগবান বড্ড স্বার্থপর, ভালো মানুষদের বড্ড আগে তুলে নেন।

কতক্ষণ একা বসেছিলাম মনে নেই, ঘোর কাটলো চেঁচামেচির শব্দে। কী হলো ব্যাপারটা? বাইরে এত আওয়াজ কেন? দরজা খুলে বাইরে যেতেই দেখলাম ওই ভদ্রমহিলার বাড়ির লোক উত্তেজিত হয়ে কথা বলছে নার্সদের সাথে, ডাক্তারদের সাথে। ওরা বোঝাবার চেষ্টা করছে কিন্তু ব্যাপারটা তর্ক বিতর্কর জায়গায় চলে যাচ্ছে।আমাদের দোষ, আমাদের ইরেস্পন্সিবিলিটির জন্যেই পেশেন্ট মারা গেছে, আমরা ডাক্তাররা শুধু পয়সা বুঝি…। সিকিউরিটি শান্ত করার চেষ্টা করছে ওদের। পরিস্থিতি বেগতিক দেখে ওদের কাছে গেলাম আমি। আমাদের কাছে তো শুধু একজন পেশেন্ট, ওদের তো তা নয়, প্রিয়জন তো, কষ্ট থেকেই বলছে নিশ্চই কথাগুলো। শান্ত করার চেষ্টা করলাম, কিন্তু না, কথা কাটাকাটি বেড়েই চলেছে। হঠাৎই কেউ একজন ধাক্কা মারলো সিকিউরিটিকে, হাত থেকে লাঠি নিয়ে নিল ওর, তারপর বেমক্কা চালিয়ে দিল আমার দিকে। ব্যাপারটা বুঝতে একটু দেরি হলো আমার, সময় পেলাম না আটকানোর…বোমা ফাটলো যেন মাথার বাঁদিকে, চোখে অন্ধকার দেখলাম আমি, তারপর লুটিয়ে পড়লাম। অজ্ঞান হওয়ার আগের মুহূর্তে ভেসে উঠলো দিদার মুখ, সকালের সেই হাসি হাসি মুখটা। হাসিটা আমার জন্যেই হারিয়ে গেল বোধহয়, বুঝলাম এই পাপবোধ কুড়ে কুড়ে খাবে আমাকে। আচ্ছা দিদা, সত্যিই কি আমার কোনো দোষ ছিল?

(৬)
ব্যথার জন্যে পেইনকিলার দিয়েছে, সবসময় একটা ঘুম ঘুম ভাব, তার ওপর ফোনটাও নিয়েছে কেড়ে, না আমি বেশি ফোন ঘাঁটবো। আমি কি বাচ্চা নাকি? “বাচ্চারও অধম।” নয়ন থাকলে এটাই বলতো। হঠাৎ ওর কথা ভেবেই হাসি পেয়ে গেল আমার। মেয়েটার সব ভালো কিন্তু কখন কোন মুডে থাকে সেটা বোঝা মানুষ তো ছার, ভগবানেরও অসাধ্য। একটা জটিল জিনিসকে যেমন ঠাণ্ডা মাথায় হ্যান্ডেল করতে পারে, তেমনই সাধারণ একটা কথা অসাধারণ লেভেলে নিয়ে গিয়ে ঝগড়া পর্যন্ত করতে পারে। ছোটবেলায় ভাবতাম শুধু মা-ই শাসন করে কিন্তু বললে বিশ্বাস করবেন না ওর এক একটা ধাতানি না মাঝেমধ্যে বুকের ঠিক বামদিকটায় গিয়ে লাগে। অনেকসময় ঠাহর করতে পারি না কে বড় আর কে ছোট! কাল তো যাওয়া হলো না, দেখাও হয়নি, ফোন করেছিল আবার? নাহ, হোয়াটসঅ্যাপে পিং করেছিল? ধুত্তেরি, ফোনটাই নেই! স্যার বাড়িতে নাকি ম্যানেজ করে দিয়েছে যাতে টেনশন না করে। তা বলে ফোনটাও নিজের জিম্মায় নিয়ে নেবেন? স্যার যে কেন এরকম করে? কী করে সময় কাটবে এখন?
হঠাৎই একটা মোলায়েম গলার আওয়াজ পেলাম, “এ কি অবস্থা, ডাক্তারবাবু আজ পেশেন্টের ভূমিকায়?” একেই কি বলে টেলিপ্যাথি নাকি নিছকই সমাপতন? হেসে বললাম, “মঞ্চটা একই আছে কিন্তু চরিত্র আলাদা।”
“বোঝো এবার, এখানে শুয়ে থাকতে কেমন বিরক্ত লাগে।”
“আর বলো না, ফোনটাও নেই। স্যার কেড়ে রেখে দিয়েছে, কি জ্বালা বলো তো!”
“কেন? থাকলে তো ওই subway surfer আর নাহলে কোনো অ্যাকশন গেম নিয়ে বসে যেতে। ঠিকই করেছে!”
“তুমিও?!”

হাসতে হাসতে ফোনটা ব্যাগ থেকে বের করলো ও। “এ নাও তোমার প্রাণ ভোমরা। বুক দিয়ে আগলে রাখো!”
“মানেটা কি? তুমি রেখেছিলে?!”
“হ্যাঁ। চার্জ ছিল না, তাই নিয়ে গেছিলাম।”
“খবর পেলে কী করে?”
“তোমার তো আসার কথা ছিল। ভেবেছিলাম বড়দির সাথে আলোচনা করে এই পুজোতেই ওদেরকে নিয়ে বেরোবার কথা কাল সবাইকে ডেকে বলব। তুমি আর আমি নিয়ে যাব ওদের কয়েকটা প্যান্ডেলে। কিন্তু অনেকক্ষণ পরেও যখন দেখলাম তুমি এলে না, ফোন করেছিলাম, তারপর জানতে পারলাম এসব…”
আজকাল আমিও তার মানে চিন্তা ভাবনায় একটু একটু করে জায়গা পাচ্ছি, ভালো ব্যাপার। বললাম, “প্ল্যানটা ভালো তবে আরেকটু মডিফাই করতে হবে।”
“কীরকম? শুনি।”
“বলছি। তার আগে বাড়িতে একটা ফোন করা দরকার। এক তো স্যারের ফোন তার ওপর কালকের নিউজে সব দেখেছে আশা করি, নিশ্চয়ই টেনশন করছে।”
“স্যার কালকে ফোন করেনি, আমি ম্যানেজ করেছি।”
“মানে? কীভাবে? তুমি ফোন করেছিলে নাকি?”
“পাগল তুমি? কীভাবে ভাবলে এত কাঁচা কাজ করব?…কাকিমাকে হোয়াটসঅ্যাপে টেক্সট করে দিয়েছিলাম যে তোমার হঠাৎ করে OT পড়েছে, কলকাতায় যেতে হবে আর্জেন্ট, তাই বাড়ি ফিরবে না।”
“দারুণ তো! কিন্তু এখন আমি কী বলব? এতক্ষণ ফোন করিনি, মা তো ব্যাপক ঝাড়বে!”
“একটু হজম করবে, বলবে ফোনে চার্জ ছিল না, পাওয়ার ব্যাংক আনতে ভুলে গেছো।”
“আর যদি এই নিউজের ব্যাপারে জিজ্ঞেস করে?”
“সেটাও আমাকে বলে দিতে হবে? নিজের মাথা খাটাতে ভুলে গেলে নাকি চোট পেয়ে? মিথ্যে বলবে যে কিছু জানো না।”

নয়ন কথাটা যত সহজে বলছে মা যে এত সুন্দরভাবে মেনে নেবে না জানতাম। সাধে কি বলে “বাঙালি মায়েরা শার্লক হোমসের জেঠিমা!” কোনোক্রমে বুঝিয়ে সুঝিয়ে মোটামুটি ম্যানেজ করে যখন ফোনটা রাখলাম, বাইরে থেকে আরেকটা মুখ উঁকি দিচ্ছে। বটু এসেছে আবার। আর এবারে একা আসেনি, সঙ্গে করে একজনকে নিয়েও এসেছে। দেখে মনে হলো বাবা, ছেলের সাথে মিল আছে মুখের। সামনের সোফায় বসতে বললাম ওদের।
ভদ্রলোক এসেই হাত জড়িয়ে ধরলেন আমার, ধন্যবাদ জানালেন ওনার ছেলেকে ওখান থেকে হসপিটালে নিয়ে আসার জন্যে, দুঃখ প্রকাশ করলেন আমার এই অবস্থা দেখে। আমি ভাবছি ওনাকে খবর দিল কে? বটু কি নিজেই করলো? কিন্তু কালই তো বলছিল আমায় ওর বাবার ফোনটা খারাপ, তাহলে? জিজ্ঞেস করলাম ওনাকে। বটু তার আগেই বললো, “ভালোকাকু, তোমার তো শরীর খারাপ ছিল। সকালেও তোমার সাথে ঠিক করে কথা হলো না। তারপর এই দিদিই আমার সাথে কথা বলে, তারপর কোথায় থাকি জেনে বাড়িতে খবর দেয়।…দিদি খুব ভালো জানো? কাল রাতেও তোমার জন্যে জেগেছিল কতক্ষণ, তুমি ঠিক আছো শুনে তারপর বাড়ি যায়, নার্সদিদি বলছিল আমাকে।” আমি তাকালাম নয়নের দিকে, বটু না বললে হয়তো জানতেও পারতাম না। নয়নের মুখ নিচের দিকে। কেন তাকাচ্ছে না নয়ন আমার দিকে? ধরা পড়ে যাবে বলে? ওর দুর্বলতাটুকুর আঁচ পেতে দেবে না বলে? ওর চোখের ভাষা যাতে না পড়তে পারি তাই? কিন্তু নয়ন, আমার যে বড্ড ইচ্ছে করছে তোমার মুখটা দেখতে, তোমার হাতদুটো একবার ধরতে। জানতে ইচ্ছে করছে মনের কতটুকু জায়গা দখল করতে পেরেছি। আমার জন্যে কেন চিন্তা করো তুমি? বরফ কি গললো তাহলে? মরুভূমিতে কি মেঘ করলো? বীজ থেকে বের হলো নতুন চারা? দিকভ্রান্ত নাবিক কি খুঁজে পেল ধ্রুবতারা?

(৭)
আজ মহালয়া, পিতৃপক্ষ শেষে দেবীপক্ষ শুরু। এইদিন মানুষেরা তাদের পূর্বপুরুষদের উদ্দেশ্যে জল দেয়, তাদের আত্মার শান্তি কামনা করে। ওই ঘটনার পরেই মনে হয়েছিল আমিও তর্পণ করব দিদার জন্যে। জানি আমার মাবাবা আছে, জানি দিদার সঙ্গে আমার কোনো আত্মীয়তা নেই, রক্তের সম্পর্ক নেই, হয়তো ব্যাপারটা অযৌক্তিক, তবুও নিজের শান্তির জন্যে করব। এক এক সময় নিজের মনের কথাও শুনতে হয়। তর্পণ সেরে এসে গাড়িটা নিয়ে বেরিয়ে পড়লাম আশ্রয় এর দিকে, নয়নও আসবে আজ। ওখানকার মানুষগুলোকে পুজোর জন্যে নতুন জামকাপড়, শাড়ি দেওয়া হবে, আমরা আগেই কিনে নিয়েছি আর সাথে পুজোয় ওদেরকে নিয়ে একটু বেরোবার কথাও বলব। এই সারপ্রাইজটা পাওয়ার পর ওদের মুখের চওড়া হাসিটা নয়ন মিস করতে চায় না আর আমি নয়নের। হাসলে নয়নকে ভারি মিষ্টি লাগে, গজদাঁতটা দেখা যায়, গালের পাশে টোল পড়ে, বুঝতে পারি বাতাসে অক্সিজেন কমে এসেছে, বুঝতে পারি এই মেয়েটার জন্যেই এতদিন অপেক্ষা করছিলাম আমি, এর হাসি দেখেই কাটিয়ে দেওয়া যায় একটা গোটা জীবন আর হাসিটা পার্মানেন্টলি দেখার ব্যবস্থা আমাকেই করতে হবে।

সবকিছু মিটে যাওয়ার পর নয়নকে ব্যালকনিতে ডাকলাম আমি। ও আজ আমার দেওয়া নীল শাড়িটা পরেছে, সাক্ষাৎ নীলপরী। আসার পথে একটা শাল পাতার ঠোঙায় ফুল নিয়ে এসেছিলাম, ওর হাতে দিলাম।
” শিউলি ফুল? আমাকে কেন দিচ্ছ?”
কারণ ফুল মানুষের মন ভালো করে, দুঃখ ভোলায়। আর শিউলি ফুল অনেকটা তোমার মতো, দাবিহীন, চাহিদাহীন, শুধু ঝরে পড়ে, অনুভব করায় আনন্দ, পুজো আসছে।…জানো নয়ন, উচ্চমাধ্যমিকের পর আমারও ইচ্ছে ছিল সাহিত্য নিয়ে পড়ার, শব্দের সঙ্গে শব্দ বুনে লেখার কিন্তু মা বাবার শখ ছিল ডাক্তারি। ভেবেছিলাম মানুষের ভালো তো করতে পারব তাই নিজের ইচ্ছেকে বিশেষ গুরুত্ব দিইনি। পড়াশোনার চাপে কবিতারা ছেড়ে গেছে আমায়, ডায়রিটা একা হয়ে গেছে, কতদিন হাত দেওয়া হয়নি। তোমার সাথে যেদিন প্রথম দেখা হয়েছিল, সেদিনকার চারটে লাইন শোনার পর আমি আবার সেই গন্ধটা পাচ্ছি জানো, ডায়রির পাতার গন্ধ। অনেকদিন আগে মরে যাওয়া একটা প্রাণ যেন আবার খলবল করছে। তুমি একটা অদ্ভুত প্রাণশক্তি দিয়েছ আমায়, আসলে কি বলো তো গোটা আমিটাকে একটা নতুন জীবন তুমি পাইয়ে দিয়েছ। তাই এই জীবনটায় যদি একসাথে হাঁটতে চাই, তুমি কি রাজি হবে? তোমার হাসির কারণ কি আমাকে হতে দেবে? দুঃখগুলোর ব্লটিং পেপার হতে দেবে? হবে আমার নিশ্চিন্ত আশ্রয়?”

নয়ন চুপ, ওর আকাশজোড়া চোখ আমার দিকে নিবদ্ধ, কিছু বলছে না ও, যেন বললেই ভেঙে যাবে। এই শিউলি ফুল, এই আলট্রামেরিন আকাশ, তাতে ছুটোছুটি করা কটনক্যান্ডি, শরতের শিউলি বোঁটার মতো রোদ সব মিথ্যে হয়ে যাবে।

“বলো নয়ন, কিছু একটা বলো। সারাজীবন চুপ করেই তো রইলে।”

বলব না, যাও।…সবসময় সব কথা মুখে বলে বোঝাতে হয় নাকি?”

সত্যি তো, জীবনে বলা আর না বলা কথার অনুপাতটা ঠিক থাকা দরকার। দেখলাম ওই দীঘল চোখে মুক্তোর দানা, একই সাথে হাসি আর কান্না, রোদ আর বৃষ্টি। তৈরি হচ্ছে মুহূর্ত, দৃষ্টি বন্ধন। আর এই সময়ে কথারা তো অতিরিক্ত, বাহুল্য মাত্র। নীরবতা অনেক বেশি মানায়!

লেখায়: মজুমদার সায়ন্তন
ছবি ঋণ: Soumya Das

Back to top button