সত্যজিৎ রায়ের সঙ্গে সম্পর্কের গুঞ্জন! একসময় ভেঙে যায় সংসারও, মাধবী মুখোপাধ্যায়ের জীবনের এই গল্প অনেকেরই অজানা

নিজস্ব প্রতিবেদন: অভিনয় তাকে কিন্তু ছোটবেলা থেকেই আকর্ষণ করতো। তবে প্রথম দিকে সেটাকে শখ হিসেবেই রেখেছিলেন তিনি। তিনি কখনোই জানতেন না বাংলা চলচ্চিত্রের চারুলতা তিনি ই। শিরোনাম দেখে আপনারা নিশ্চয়ই বুঝে গিয়েছেন আমরা কার কথা বলছি! আমরা বলছি বাংলার জনপ্রিয় চলচ্চিত্রাভিনেত্রী তথা নারীকেন্দ্রিক ছবির অন্যতম নায়িকা মাধবী মুখোপাধ্যায়ের কথা। একটা সময়ে তিনিই ছিলেন পরিচালকদের প্রধান এবং অন্যতম পছন্দ।

১৯৪২ সালের ১০ই ফেব্রুয়ারি জন্মগ্রহণ করেন মাধবী মুখোপাধ্যায়। শিশির ভাদুড়ি, নির্মলেন্দু লাহীড়ী এবং ছবি বিশ্বাস এর মতো অভিনেতাদের সঙ্গে মঞ্চে কাজ করেছেন তিনি। প্রথম জীবনে শিশু শিল্পী হিসেবেই কাজ শুরু করেছিলেন মাধবী দেবী। প্রেমেন্দ্র মিত্র পরিচালিত দুই বিয়ে ছবিতে অভিনয় করতে দেখা গিয়েছিল তাকে। তখন অবশ্য তার নাম ছিল মাধুরী। এরপর ১৯৬০ সালে ২২শে শ্রাবণ নামের একটি ছবি মুক্তি পায় মৃণাল সেনের পরিচালনায়। এই ছবি থেকেই অভিনেত্রীর নাম পাল্টে যায়। বিজয় চট্টোপাধ্যায় তাকে নতুন নাম দেন মাধবী। তারপর এই নামে তিনি বাংলা চলচ্চিত্রকে সমৃদ্ধ করে এসেছেন।

‘আজ কাল পরশু’ ছবিতে মাধবী মুখোপাধ্যায়ের অভিনয় দেখে রীতিমত মুগ্ধ হয়ে গিয়েছিলেন পরিচালক সত্যজিৎ রায়। তিনি মাধবী মুখোপাধ্যায় কে ‘মহানগর’ ছবিতে অভিনয়ের সুযোগ দেন। এই চলচ্চিত্রে আরতির  ভূমিকায় মাধবী মুখোপাধ্যায়ের অভিনয় শুধুমাত্র বাংলা নয় বিশ্ব চলচ্চিত্রের সম্পদ। অনিল চট্টোপাধ্যায় এর বিপরীতে মাধবীকে কেন্দ্র করে আবর্তিত হয়েছিল মহানগরের গল্প। মধ্যবিত্ত পরিবারের বধু আরতির অপটুহাতে লিপস্টিক পড়ার মধ্য দিয়েই ঘটে যায় নিঃশব্দ বিপ্লব।

সংসারের প্রয়োজনে চৌকাঠের বাইরে পা রাখেন ছবির আরতি। তার হাত ধরেই আটপৌডরত্ব দূর হয় বাঙালির মধ্যবিত্ত পরিবারের গৃহবধূদের। ১৯৬৩ সালে অর্থাৎ মহানগর মুক্তি পাওয়ার পরের বছরেই মুক্তি পায় মাধবী মুখোপাধ্যায়ের অভিনীত চারুলতা। সত্যজিৎ রায় পরিচালিত এই ছবির মাধ্যমেই বাঙালির মনের মনিকোঠায় চিরস্থায়ী জায়গা করে নেন মাধবী মুখোপাধ্যায়। এক সাক্ষাৎকারে মাধবী মুখোপাধ্যায় বারংবার জানিয়েছেন চারুলতাই তার জীবনের শ্রেষ্ঠ ছবি।

চারুর মতন জটিল চরিত্র পর্দায় ফুটিয়ে তুলতে পেরে তার ভীষণ ভালো লেগেছিল। অভিনয়ের শুরুতেই মহানগর এবং চারুলতার মতন নারী কেন্দ্রিক ছবিতে তার অভিনয় তার জীবনের গতিপথ পাল্টে দিয়েছিল। সত্যজিৎ রায়ের সঙ্গে প্রথম সাক্ষাতের স্মৃতি এখনো অমলিন মাধবীর মনে। জানা যায় সেই সময় সত্যজিৎ বাবুর ইউনিট থেকে দুই জন এসে তার সঙ্গে কথা বলেন। তারা জানান যে পরিচালক নায়িকার সঙ্গে দেখা করতে চান। সেই সময় মাধবী দেবী থাকতেন উত্তর কলকাতায়। অন্যদিকে সত্যজিৎ বাবু থাকতেন দক্ষিণ কলকাতায়। অতদূর ট্যাক্সি করে যেতে আপত্তি ছিল মাধবী মুখোপাধ্যায়ের।

এছাড়াও হয়তো কোন একটা দিক থেকে মাধবী নাকি নিশ্চিত ছিলেন তাকে খারিজ করে দেবেন পরিচালক। কিন্তু মাধবী মুখোপাধ্যায়ের মা ছিলেন অনড়। শেষ পর্যন্ত মায়ের কথাতেই মাধবী মুখোপাধ্যায় সত্যজিৎ রায়ের সঙ্গে দেখা করতে যান। দুই থেকে তিনবার সাক্ষাৎকারের পরেই তার হাতের চিত্রনাট্য তুলে দেন বিশ্ববরেণ্য পরিচালক। পরবর্তীতে সত্যজিৎ রায় বলেছিলেন মাধবীর মধ্যে অভিনয়ের সহজাত গুণ রয়েছে। তাকে খুব বেশি দেখাতে বা বোঝাতে হয় না। সহজেই অভিনেত্রী নিজের সেরাটা উজাড় করে দেন পর্দায়।

এক সাক্ষাৎকারে বারংবার সত্যজিৎ রায়  এর প্রশংসা করেছেন মাধবী মুখোপাধ্যায় ও। মাধবীর কথায়, “সত্যজিৎ রায়ের মতন অভিনয় এর গুণদক্ষতা আর কোন পরিচালকের মধ্যে আমি দেখিনি। তার চিত্রনাট্য ছিল শেষ কথা”। অনেকেই হয়তো শুনেছেন সত্যজিৎ রায় আর মাধবী মুখোপাধ্যায়ের মধ্যে একটা সম্পর্কের গুঞ্জন ও বাংলা চলচ্চিত্র জগতে সেই সময় ছড়িয়ে পড়েছিল। যদিও তা নিয়ে কখনোই দুজনের কেউ মুখ খোলেননি। তবে এই টানা পড়েন লুকিয়ে থাকেনি বিজয়া রায়ের কলমে।

তিনি তাঁর আত্মজীবনী আমাদের কথায় লিখেছেন, সত্যজিৎ রায় আর মাধবী মুখোপাধ্যায়ের সম্পর্কের এই গুঞ্জন তাকে কষ্ট দিয়েছিল। যদিও সেখানে মাধবী মুখোপাধ্যায়ের কোন পরিচয় প্রকাশ তিনি করেননি। ১৯৬৫ সালে মুক্তি পায় সত্যজিৎ রায়ের পরিচালনায় মাধবী মুখোপাধ্যায়ের শেষ ছবি মহাপুরুষ কাপুরুষ। এরপর আর কখনো দুজনকে একসঙ্গে কাজ করতে দেখা যায়নি।

শুধু সত্যজিৎ রায় নন মাধবী দেবী তার অভিনয় প্রতিভার ছাপ রেখেছেন মৃণাল সেন, ঋত্বিক ঘটকের পরিচালনাতেও। ঋত্বিক ঘটকের পরিচালিত ছবি সুবর্ণরেখায় মাধবী মুখোপাধ্যায়ের কালজয়ী অভিনয় আজও উজ্জ্বল দর্শকের মনে। উত্তম কুমারের বিপরীতে অগ্নিশ্বর, ছদ্মবেশী,শঙ্খবেলা ছবিতে সাবলীল অভিনয় খুব সহজেই ছক ভেঙে দিয়েছিল।মাধবী মুখোপাধ্যায়ের ক্যারিয়ারের উল্লেখযোগ্য বাকি ছবি হল দিবারাত্রির কাব্য, সমান্তরাল, বিন্দুর ছেলে, গণদেবতা, সাহেব, কলকাতা ৭১, চোখ এবং উৎসব। বড় পর্দার পাশাপাশি তিনি কিন্তু ছোট পর্দাতেও সমানতালে কাজ করে এসেছেন।

কুসুমদোলা, ইষ্টিকুটুম, হিয়ার মাঝে, নকশি কাঁথা প্রভৃতি জনপ্রিয় ধারাবাহিকে অভিনয় করেছেন মাধবী মুখোপাধ্যায়। ব্যক্তিগত জীবনে অভিনেতা নির্মল কুমারের সঙ্গে গাটছড়া বেধেছিলেন তিনি। যদিও সেই দাম্পত্য খুব ভালোভাবে বেশিদিন টেকেনি। বিবাহিত সম্পর্ক থাকলেও বহু বছর ধরেই কিন্তু তারা আলাদা থাকেন। তবে দুজনের মধ্যে রয়েছে ভালো বন্ধুত্ব।

এখনো একে অন্যের বাড়িতে তারা যাতায়াত করেন। নির্মল বাবুর জন্মদিনে অনেকবার দেখা গিয়েছে স্ত্রী মাধবী মুখোপাধ্যায়কে। কয়েক মাস আগেই দারুন অসুস্থ হয়ে পড়েছিলেন তিনি। রক্তাল্পতার পাশাপাশি রক্তের শর্করার পরিমাণ বেড়ে গিয়েছিল তার। কয়েকদিন হাসপাতালে ভর্তি থাকার পরে বাড়ি ফেরেন একসময়ের এই জনপ্রিয় অভিনেত্রী। বার্ধক্যজনিত কিছু অসুস্থতা থাকলেও বর্তমানে তিনি ভালোই আছেন।

Back to top button